পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদলের পর নবান্নে অনুষ্ঠিত হল নতুন সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠক। আর সেই বৈঠক থেকেই প্রশাসনিক সংস্কার, সীমান্ত সুরক্ষা, কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
রাজ্য বিজেপির তরফে প্রকাশিত প্রেস নোট অনুযায়ী, নতুন সরকার “ডাবল ইঞ্জিন উন্নয়নের” পথে পশ্চিমবঙ্গকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, পশ্চিমবঙ্গে এখন থেকে “সুশাসন, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন”-কেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই সরকার আমিত্বে চলে না, নীতিতে চলে।” পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi-র “ভয় আউট, ভরসা ইন” বার্তার উল্লেখ করে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাংলার মানুষ যে নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক হিংসা এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার অভিযোগ তুলছিলেন, নতুন সরকার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকে সর্বপ্রথম ধন্যবাদ জানানো হয় রাজ্যের সাধারণ ভোটার, প্রশাসনিক কর্মী এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সকলকে। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বহু বছর পর বাংলায় “ভয়মুক্ত, রক্তপাতহীন এবং অবাধ নির্বাচন” অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশে ভোট সম্পন্ন হওয়ায় সরকার পক্ষের তরফে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক হিংসায় নিহত ভারতীয় জনতা পার্টির ৩২১ জন কর্মী ও সমর্থকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, শহীদ পরিবারের পাশে সরকার সর্বতোভাবে থাকবে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল সীমান্ত সুরক্ষায় বিএসএফ-কে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত। মুখ্যমন্ত্রীের নির্দেশ অনুযায়ী, ভূমি ও রাজস্ব দফতর এবং মুখ্য সচিবকে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে বলা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যার মোকাবিলায় কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।
স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও বড় ঘোষণা এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব ও মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের উপদেষ্টাকে দ্রুত কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এর ফলে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিমা পরিষেবার সুবিধা পাবেন।
শুধু আয়ুষ্মান ভারত নয়, প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা, প্রধানমন্ত্রী কৃষক বীমা যোজনা, পিএম শ্রী, বিশ্বকর্মা, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও এবং উজ্জ্বলা যোজনা সহ একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা শাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সমস্ত প্রয়োজনীয় আবেদন ও প্রশাসনিক নথি দ্রুত কেন্দ্রীয় মন্ত্রকে পাঠাতে।
সরকারি প্রশাসনের আধুনিকীকরণেও জোর দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের আইএএস আধিকারিকদের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রশাসনিক দক্ষতা এবং নীতি বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা BNS অনুযায়ী রাজ্যের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
যুব সমাজের জন্যও বড় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকারি চাকরির আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫ বছর বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার কারণে বহু চাকরিপ্রার্থী বয়সসীমার সমস্যায় পড়েছিলেন। নতুন সিদ্ধান্তে বহু যুবক-যুবতী আবারও সরকারি চাকরির সুযোগ পাবেন।
জনগণনা ও নাগরিক নথিভুক্তিকরণ প্রসঙ্গেও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ১৬ জুন ২০২৫-এর নির্দেশ পূর্ববর্তী সরকার কার্যকর করেনি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই সেই প্রশাসনিক নির্দেশ কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তবে সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ দূর করতেও সচেষ্ট হয়েছে নতুন সরকার। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমানে চালু থাকা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি বন্ধ করা হবে না। তবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সেগুলি পরিচালিত হবে। তিনি বলেন, কোনও মৃত ব্যক্তি, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বা অযোগ্য ব্যক্তি সরকারি সুবিধা পাবে না। প্রকৃত উপভোক্তার কাছেই সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য।
রাজনৈতিক মহলের মতে, প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠক থেকেই প্রশাসনিক কড়াকড়ি, কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আইন-শৃঙ্খলা ইস্যুতে স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে নতুন সরকার। বিজেপির পক্ষেও এটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ নির্বাচনী প্রচারে যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি সামনে আনা হয়েছিল, তার বাস্তব রূপ দেওয়ার ইঙ্গিতই মিলেছে এই বৈঠকে।
নবান্নের প্রথম বৈঠক থেকেই তাই স্পষ্ট, নতুন সরকার নিজেদের প্রশাসনিক অবস্থানকে “সুশাসন ও সমন্বয়ের সরকার” হিসেবেই তুলে ধরতে চাইছে। এখন দেখার, ঘোষিত সিদ্ধান্তগুলি আগামী দিনে কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার কতটা প্রভাব পড়ে।


